March 1, 2026, 4:14 pm
দেবাশীষ মন্ডল আশীষ, অতিথি প্রতিবেদক ॥
পিরোজপুর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পিরোজপুর-২ (নেছারাবাদ, কাউখালী, ভান্ডারিয়া) আসনে এবার চমক দেখিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। সাত প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন ১,০৫,১৮৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী শামীম সাঈদী পেয়েছেন ৯৬,৮৯৭ ভোট। জয়-পরাজয়ের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৮,২৮৮ ভোট। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তিন উপজেলার ভোটের চিত্র ভিন্ন হলেও নেছারাবাদ উপজেলার বিপুল ব্যবধানই শেষ পর্যন্ত বিজয় নিশ্চিত করেছে। নেছারাবাদ উপজেলায় আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন পেয়েছেন ৬৯,৫০০ ভোট, বিপরীতে শামীম সাঈদী পেয়েছেন ৩৭,১৬৩ ভোট। অর্থাৎ এই উপজেলাতেই
৩২ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে ছিলেন। অন্যদিকে, কাউখালী উপজেলায় শামীম সাঈদী ১৮,৯৯১ ভোট পেয়ে এগিয়ে থাকলেও সোহেল মনজুর পান ১৫,০০৩ ভোট। একইভাবে ভান্ডারিয়া উপজেলায়ও শামীম সাঈদী ৩৯,০১৯ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন, যেখানে সোহেল মনজুর পেয়েছেন ১৯,৯১০ ভোট। ফলে দুই উপজেলায় পিছিয়ে থাকলেও নেছারাবাদের বিশাল ব্যবধানই সামগ্রিক ফলাফলে নির্ধারণী ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পিরোজপুর-২ আসনে নেছারাবাদ উপজেলাকে দীর্ঘদিন ধরেই ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ উপজেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন, যাদের সমর্থন নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। এবারের নির্বাচনে এই ভোটারদের বড় অংশ ধানের শীষ প্রতীকের দিকে ঝুঁকে পড়ায় বিএনপি প্রার্থী বড় ব্যবধানে এগিয়ে যান। স্থানীয়দের মতে, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত ইমেজ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সোহেল মনজুর তার প্রচারণায় নেছারাবাদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং জনসভা ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন। আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী নূরুল ইসলাম মনজুর–এর সন্তান। মুক্তিযুদ্ধকালীন নবম সেক্টরের বেসামরিক প্রধান হিসেবে তার পিতার ভূমিকা এবং পরবর্তীতে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে অবদান এলাকাবাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী শামীম সাঈদী ছিলেন প্রয়াত আলেম ও সাবেক সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন সাঈদী–এর ছেলে। তার পারিবারিক জনপ্রিয়তা থাকলেও নেছারাবাদ উপজেলায় প্রত্যাশিত সমর্থন পাননি। যদিও কাউখালী ও ভান্ডারিয়ায় তিনি এগিয়ে ছিলেন, তবে নেছারাবাদের ফলাফল সেই ব্যবধান পূরণ করতে পারেনি। এদিকে, একই পরিবারের আরেক সদস্য মাসুদ সাঈদী পিরোজপুর-১ আসনে বিজয়ী হওয়ায় পিরোজপুর-২ আসনেও জামায়াতের জয়ের সম্ভাবনা জোরালো ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি শামীম সাঈদী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন শুধু একটি আসনের ফল নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দুই উপজেলায় পিছিয়ে থেকেও শুধুমাত্র নেছারাবাদের বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিএনপির প্রার্থীর বিজয় প্রমাণ করেছে, এই আসনের প্রকৃত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রক নেছারাবাদের ভোটাররা। জামায়াতের শক্ত অবস্থান থাকা সত্ত্বেও সাংগঠনিক কৌশল, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং ভোট ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে বিএনপির এই বিজয় ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply